Thursday, February 29, 2024
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
Homeবাংলাদেশঅভাবের কারণে ডাক্তার না দেখিয়ে নাপা সিরাপ খাওয়ান মা

অভাবের কারণে ডাক্তার না দেখিয়ে নাপা সিরাপ খাওয়ান মা

ইসমাইল হোসেন ও লিমা বেগম দম্পতির প্রথম সন্তান জন্মের তিনদিনের মাথায় মারা যায়। সেই সন্তানকে হারানোর বেদনা ভুলিয়ে রেখেছিল পরবর্তী দুই সন্তান ইয়াছিন খান (৭) ও মোরসালিন খান (৫)। কিন্তু তাদেরও শেষ রক্ষা হলো না। একসঙ্গে দুই সন্তানকে হারিয়ে এখন পাগলপ্রায় এই দম্পতি। রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন। তিনি সিলেটের একটি ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তার স্ত্রী লিমা বেগম কাজ করেন আশুগঞ্জের একটি চাল কলে। অভাবের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। টাকার অভাবে জ্বরে আক্রান্ত দুই শিশু সন্তানকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে পারেননি তারা। বাড়ির পাশের একটি ফার্মেসি থেকে নাপা সিরাপ এনে খাওয়ান। সেই সিরাপ খাওয়ানোর পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়ে শিশু ইয়াছিন ও মোরসালিন। পরে তাদের দুজনেরই মৃত্যু হয়।

দুই শিশুর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, কয়েকদিনেও জ্বর না কমায় গত ১০ মার্চ বিকেলে ছোট ছেলে মোরসালিন তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলে মা লিমা বেগমকে। তখন মা তাকে আশ্বাস দেয়, চাল কল থেকে কাজের টাকা পাওয়ার পর ভালো চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবে। পরে মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে দুই শিশুর দাদি লিলুফা বেগম পাশের বাজারের মা ফার্মেসি থেকে এক বোতল নাপা সিরাপ কিনে আনেন। এরপর সেই সিরাপ আধা চামচ করে ইয়াছিন ও মোরসালিনকে খাওয়ানো হয়। এর কিছুক্ষণ পরই তারা বমি শুরু করে।

কাঁদতে কাঁদতে দুই শিশুর মা লিমা বেগম বলেন, “ওইদিন আমার ছেলে বলল, ‘আম্মা আমাকে ভালো ডাক্তারের কাছে নিবা না?’ আমি তখন বলেছি, ভালো ডাক্তারের কাছে এখন নিতে পারব না, আমার কাছে এখন টাকা নেই। আপাতত দুই ভাইকে একটা নাপা সিরাপ এনে খাওয়াই। সিরাপ খাওয়ানোর ১৫-২০ মিনিট পরই দুজনেই বমি শুরু করে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে ডাক্তাররা অক্সিজেন দিয়ে জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে।”

লিমা বেগম অভিযোগ করে বলেন সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তার জানায়- ‘আপনার ছেলেরা সম্পূর্ণ সুস্থ। বাড়িতে নিয়ে টক আর পানি খাওয়ান বেশি করে।’ কিন্তু বাড়িতে আনার পথেই আমার এক ছেলে মারা যায়। বাড়িতে এসে আরেকজনের মৃত্যু হয়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ডাক্তাররা তাহলে কী দেখল? আমার ছেলেগুলোকে একটু চিকিৎসাও তারা দিল না কেন?’এ দিকে, নাপা সিরাপ খেয়ে দুই শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠার পর থেকে সপরিবারে গা ঢাকা দিয়েছেন দুর্গাপুর গ্রামের সড়ক বাজারের মা ফার্মেসির মালিক মো. মঈনউদ্দিন। রোববার (১৩ মার্চ) দুপুরে দুর্গাপুরের পার্শ্ববর্তী তাজপুর গ্রামে মঈনউদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি।

ফার্মেসি পরিচালনার জন্য ঔষধ প্রশাসন থেকে ড্রাগ লাইসেন্স নেওয়ার পাশাপাশি ন্যূনতম সি-গ্রেডের ফার্মাসিস্ট কোর্স করা একজন ফার্মাসিস্টের প্রয়োজন হয়। তবে মা ফার্মেসিতে এগুলো ছিল কি না সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।

এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ঔষধ প্রশাসনের সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হোসাইন মো. ইমরান বলেন, “আশুগঞ্জ উপজেলায় ‘মা ফার্মেসি’ নামে ১৭টি লাইসেন্স আছে। এখন এর মধ্যে দুর্গাপুরের মা ফার্মেসির লাইসেন্স আছে কি না সেটি স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। কারণ মালিককে আমরা পাইনি। সেজন্য তার কাগজপত্র আছে কি না সেটি যাচাই করতে পারছি না। এছাড়া কোনো ফার্মাসিস্ট ছিল কি না সেটিও জানা যাচ্ছে না। তার সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত তার ফার্মেসির বৈধতা সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে না।”

বর্তমানে দুর্গাপুর গ্রামের সড়ক বাজারে ৯টি ফার্মেসি আছে। এর মধ্যে কেবল তিনটি ফার্মেসি ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ওষুধের অর্ডার দেন। বাকিরা কিশোরগঞ্জের ভৈরব এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাইকারি ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কেনেন বলে জানা গেছে। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের আশুগঞ্জ উপজেলায় দায়িত্ব পালনকারী সিনিয়র মেডিকেল প্রমোশন এক্সিকিউটিভ মোজাম্মেল হক বলেন, ‘সব ফার্মেসির সঙ্গে আমাদের ব্যবসা নেই। আলোচিত এই মা ফার্মেসিও আমাদের কাছ থেকে ওষুধ নেয় না। আমাদের কাছ থেকে মাত্র ৩টি ফার্মেসি ওষুধ নেয়।’

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

Most Popular

Recent Comments