রাজধানীর ডেমরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব, যারা ডাকাত দলের সদস্য বলে জানিয়েছে। ডাকাতির প্রস্তুতির সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। দুইজনের মধ্যে দলটির সর্দারও আছেন। গ্রেপ্তারের পর তাদের থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। দিনে বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও রাতে ডাকাতি করত চক্রটির সদস্যরা। বাসাবাড়ি ছাড়া মহাসড়কেও ডাকাতি করত তারা। আর যে বাসায় ডাকাতি করত ডাকাতির আগে সেখানে রেকি করত। বাসার ডিস সংযোগ কেটে দিয়ে মেকানিক সেজে বাসায় ঢুকে ডাকাতি করা হতো। এজন্য যেসব বাসায় অভিভাবক থাকে না এমন বাসাকেই বেছে নিত চক্রটি। সর্বশেষ ডেমরা এলাকায় এক প্রবাসীর স্ত্রীর বাসায় ডাকাতির চেষ্টা করতে গেলে র্যাব তাদের ধরে ফেলে।
র্যাব বলছে, চক্রটির কেউ ডিজিটাল প্রেসে আবার কেউ মিস্ত্রির কাজ করে। মূলত দিনে এসব কাজ করলেও রাতে ডাকাতি করে বেড়াত। বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তারও হয়েছে তাদের কেউ কেউ। কিন্তু জেল থেকে বেরিয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। গত সোমবার রাতে ডাকাত চক্রের দুই সদস্য উজ্জল হোসেন ও মো. রাশেদকে বিদেশি পিস্তল, রিভলবার, তিনটি ককটেল এবং ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত বিপুল সরঞ্জামাদিসহ গ্রেপ্তার হয়। দুইজনের মধ্যে উজ্জল ডাকাত দলের সর্দার।
তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে দুপুরে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন ডাকে র্যাব। সেখানে কথা বলেন র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. ক. আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, ডাকাত দলের সর্দার উজ্জল হোসেন। তিনিই পুরো দলটি পরিচালনা করেন। তার দলের মোট ১০ জন সদস্য রয়েছে। দলটি রাজধানীর ডেমরা, শনিরআখড়া, যাত্রাবাড়ী ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় বড় ধরনের ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। গত ৫ মাসে নারায়ণগঞ্জসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ৭ টি ডাকাতি করেছে তারা। এছাড়া আরও ৮ থেকে ১০টি বড় ধরনের ডাকাতির চেষ্টাও চালিয়ে ব্যর্থ হয়।
যেভাবে রেকি করে ডাকাতি করত চক্রটি
র্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, ডাকাত দলের সদস্যরা বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত। এর পাশাপাশি ডাকাতি করত। ডাকাতির আগে টার্গেট করা বাসায় রেকি করত। ডাকাত সর্দার উজ্জল দলের অন্যান্য সহযোগীদের নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াত। ডাকাতির জন্য রেকিপূর্বক বিভিন্ন বাড়ি টার্গেট করত। টার্গেট অনুযায়ী উজ্জল সহযোগীদের নিয়ে সেই বাড়িগুলোতে ডাকাতির জন্য প্রস্তুতি নিত। সুযোগ বুঝে টার্গেটকৃত বাড়িতে বিদেশি পিস্তল, বিদেশি রিভলবার, বিস্ফোরক সরঞ্জামাদি এবং বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ডাকাতি করত।
সম্প্রতি ডেমরা এলাকায় একটি চারতলা বাড়িকে টার্গেট করেছিল চক্রটি। সেই বাড়ির মালিক নিলুফা ইয়াসমিন বাড়ির অন্যান্য ফ্লোর ভাড়া দিয়ে দ্বিতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাটে একা থাকেন। তার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে থাকেন। তাছাড়া সম্প্রতি তার দুই ছেলে প্রবাসে চলে যাওয়ায় কিছুদিন ধরে তিনি বাড়িতে একা বসবাস করে আসছিলেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে ডাকাত দল গত এপ্রিল মাস থেকেই বাড়িটি টার্গেট করেন। এরপর বেশ কয়েকবার বাড়িটির ডিস সংযোগের তার কেটে দেয় এবং বাসায় নক করে ডিসের মেকানিক পরিচয়ে ডিস সংযোগ ঠিক করার নামে রেকি করে। গত সোমবার ডাকাত সর্দার উজ্জলের নেতৃত্বে অস্ত্রশস্ত্রসহ বাড়িতে হামলা করার জন্য প্রবেশ করে। খবর পেয়ে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
ডাকাত দলের সর্দার উজ্জল ব্যানার, বিলবোর্ড তৈরির ডিজিটাল প্রিন্টিং প্রেসের দোকানে কাজ করেন। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করে তার মামার স্টিলের আসবাবপত্র তৈরির কারখানায় পাঁচ বছর কাজ করেন। এরপর সেখান থেকে পালিয়ে এসে ছিনতাই, চুরিসহ নানা অপকর্মে জড়ায়। পরে তার নেতৃত্বে একটি ডাকাত চক্র তৈরি করেন। অন্যদিকে গ্রেপ্তার রাশেদ ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে রংমিস্ত্রির কাজ করে। সেও কাজের অজুহাতে বিভিন্ন বাড়িতে রেকি করত। রাশেদ কাজের ছদ্মবেশে ডাকাতির শেষে স্থান ত্যাগের রাস্তা রেকি করে রাখত। রেকি শেষে রাশেদ ডাকাত দলের নেতা উজ্জলকে রেকির সব তথ্য জানাত। বাসাবাড়ি ছাড়াও মহাসড়কে রাতে বিভিন্ন গাড়ি আটকিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডাকাতি করত তারা। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানান র্যাবের এই কর্মকর্তা।



