রুদ্র মিজান : কোনো এক কারণে গত কয়েক দিন থেকেই দেশ-বিদেশে থাকা শুভাকাঙ্খিরা ক্ষুদেবার্তা দিচ্ছেন। সাবধানে থাকতে বলছেন। শুভ কামনা করছেন। এই যে মানুষের ভালোবাসা, এতে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। গত ৪ মে উত্তরা থেকে একজন ফোনে ঈদের শুভেচ্ছা জানালেন। নম্বরটি ফোনে সংরক্ষণ করা ছিল না। কথা বলার পরই চিনতে পারলাম। বললেন, দেখা করতে চান। ঈদের আগেই দেখা করতে চেয়েছিলেন। আমাকে ফোনে পাননি। তিনি বছরে একাধিকবার দেখা করতে আসেন। হাসিমুখে কৃতজ্ঞতা জানান। আমি বুঝাতে চেষ্টা করি আমার তেমন কোনো অবদান নেই। আল্লাহ সহায় ছিলেন বলেই তিনি তার সন্তানকে ফিরে পেয়েছেন। বেশ কয়েক বছর আগের কথা। তার সন্তান নিখোঁজ ছিল। তখন জঙ্গি তৎপরতা, গুম.. নানা সন্দেহ । খোঁজ নিয়ে যত্ম করে মানবজমিনে এ নিয়ে প্রতিবেদন করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর টনক নড়ে। ছিলেটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তারপর থেকেই ছেলের বাবা প্রায়ই সরাসরি এসে কৃতজ্ঞতা জানান। দোয়া করেন।
ভয়ঙ্কর প্রতারণা নিয়ে গত বছরের শেষের দিকে একটি প্রতিবেদন করেছিলাম। এক তরুণী কিভাবে নানা পরিচয়ে একটি ছেলেকে জিম্মি করে। দিনের পর দিন নির্যাতন করতে থাকে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর একদিন অফিসে একজন বয়স্ক নারী উপস্থিত। সঙ্গে ভিকটিম ছেলেটি। মায়ের চেয়ে বয়সে বড় তিনি। আমার সাথে কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে যান। কান্না করছিলেন। আমার মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন। আমি শুধু ছেলেটিকে বললাম, এতো কষ্ট করে আন্টিকে নিয়ে অফিসে এলেন কেন। তিনি বললেন, আমাকে দেখতে চেয়েছেন। ওই প্রতিবেদন নাকি তার অনেক উপকারে এসেছে। নানা কুৎসা রটানো হচ্ছিলো পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে। জানতে চাইলেন বাসা কোথায়। তারপর নিজ হাতে রান্না করে খাবার পাঠিয়ে দিলেন বাসায়। ফোনে বললেন, আমি খেলে তিনি খুশি হবেন।
২০১৪ সালের নভেম্বরে গেলাম বগুড়ার কাহালুতে। শীতলাই গ্রাম। এক হতদরিদ্র পরিবারের বাবা ও তার কিশোর ছেলে কারগারে। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা। ছেলেটি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। সামনে পরীক্ষা। জামিন না হলে পরীক্ষা হবে না। গ্রামে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাইনি। পেয়েছি থানার ওসির অতি উৎসাহ আর স্থানীয় দু’জনের সম্পৃক্ততা। প্রতিবেদন প্রকাশের পর ছেলেটির জামিন হয়েছিল। পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলো। আজ অবধি বগুড়া থেকে কেউ না কেউ নক করে। জানতে চায়, আমি কেমন আছি?
২০১৪ সালের শুরুতে মিরপুরের পল্লবীর একটি ক্যাম্পে আগুনে পুড়িয়ে আট ও গুলি করে একজনকে হত্যা করা হয়। দিনের পর দিন সেখানে গিয়েছি। ঘটনার সামনের-পেছনের অনেকের তথ্য সংগ্রহ করেছি। হামলার ভিডিও সংগ্রহ করেছি। কিন্তু নিহতদের স্বজনরা এ নিয়ে কোনো মামলা করতে পারেননি। যেহেতু হত্যাকাণ্ড পুলিশ বাদি হয়ে মামলা করেছিলো। মামলায় জড়িত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। তদন্তে কিচ্ছু মিলেনি। যখন নিহতদের পরিবারের বেঁচে থাকা একমাত্র অভিভাবক ইয়াসিন মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখনই রহস্যময় গাড়ি চাপায় মৃত্যু ঘটে তার। এসব সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ওই এলাকার অনেকের সঙ্গে সখ্যতা হয়। মুগ্ধ হই তাদের ভালোবাসায়। দিন-দিন এই সম্পর্ক, সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় হতেই থাকে।
এমনও ঘটেছে নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেকই ভিন্নপথে হেঁটেছেন। আমি অবিচল ছিলাম। যা দেখেছি তাই লিখেছি। তারপর.. অনেক পরে বাবার বয়সী কেউ হয়তো কোথাও দেখে চিনতে পেরেছেন। বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না করেছেন। বলেছেন কিভাবে তাকে হারানো হয়েছে। কিন্তু কেউ সেটা লিখলো না!সংবাদকর্মীর অল্প দিনের ক্যারিয়ারে এরকম ঘটনা অনেক। বিপুল মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। পাচ্ছি।
উল্টোদিকে নেতিবাচক অভিজ্ঞতাও কম না। এ থেকে শিখতে চেষ্টা করি। কিন্তু ভুলে থাকতে চাই যা মনে হলে কষ্ট হয়। খারাপ লাগে। সব চে খারাপ লাগে যখন কেউ ভুল বুঝে। যে ভুলের বাস্তব কোনো অস্তিত্বই নাই। আমি শুধু ভালোবাসার কথা মনে রাখতে চাই। ভালোবাসা পবিত্র। এজন্য আমি আজন্ম কৃতজ্ঞ মহান আল্লাহর প্রতি।



