Thursday, February 29, 2024
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
Homeবাংলাদেশছদ্মবেশে ২১ বছর লুকিয়ে ছিলেন আজিজুল

ছদ্মবেশে ২১ বছর লুকিয়ে ছিলেন আজিজুল

২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগ তাকে গ্রেফতার করে। মঙ্গলবার (১ মার্চ) রাজধানীর খিলক্ষেত থানাধীন খিলক্ষেত বাজার মসজিদের সামনে থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার আসামির নাম মো. আজিজুল হক রানা ওরফে শাহনেওয়াজ ওরফে রুমান (৪৪)।

সিটিটিসি বলছে, গ্রেফতার আজিজুল হক দীর্ঘ ২১ বছর ছদ্মবেশে নানা পেশার আড়ালে নিজেকে আত্মগোপনে রাখেন। এভাবে তিনি অত্যন্ত গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কয়েকবার দেশ ত্যাগের পরিকল্পনাও করেছিলেন আজিজুল হক। তবে ব্যর্থ হয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ভিন্ন ভিন্ন নামে আত্মগোপনে ছিলেন। নিজেকে লুকিয়ে রাখতে কখনো টেইলারিং, কখনো মুদি দোকানি, বই বিক্রেতা, গাড়িচালক ও সবশেষ প্রিন্টিং ও স্ট্যাম্প প্যাড বানানোর কাজ করতেন।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান গ্রেফতারের সময় আজিজুল হকের কাছ থেকে জিহাদি বই, দুটি মোবাইল ফোনসেট, পেনড্রাইভ ও কম্পিউটারের হার্ডডিক্স উদ্ধার করা হয়। তার বিরুদ্ধে খিলক্ষেত থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করা হয়েছে।
বুধবার (২ মার্চ) দুপুরে মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান।

তিনি বলেন, ২০০০ সালে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার সফরসঙ্গীদের হত্যার উদ্দেশ্যে মাটির নিচে ৪০ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়। এছাড়া হেলিপ্যাডের পাশে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখেন নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের সক্রিয় সদস্যরা। গ্রেফতার আজিজুল হক রানা মুফতি হান্নানের সঙ্গে বোমা পুঁতে রাখার দায়িত্বে ছিলেন। ঘটনাটি প্রকাশ পেলে এবং বোমা দুটি উদ্ধারের পর আজিজুল হক কোটালীপাড়া থেকে পালিয়ে ঢাকায় চলে আসেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গ্রেফতার আজিজুল হক রানা ১৯৮৭ সালে গাজীপুরের শ্রীপুরে জামিয়া আনোয়ারিয়া মাদরাসায় নুরানি বিভাগে ভর্তি হন। এ সময় ওই মাদরাসার ওস্তাদ ও হরকাতুল জিহাদের সক্রিয় সদস্য মুফতি হান্নানের অনুসারী মাওলানা আমিরুল ইসলামের সংস্পর্শে আসেন। মাওলানা আমিরুল ইসলাম তাকে হরকাতুল জিহাদে যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। মাদরাসায় মুফতি হান্নান, আব্দুর রউফ, আব্দুস সালামসহ হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি) বিভিন্ন সিনিয়র সদস্যদের যাতায়াত ছিল। হুজি সদস্যরা ওই মাদরাসায় গোপন বৈঠক করতেন।

অতিরিক্ত কমিশনার আসাদুজ্জামান বলেন, আজিজুল হক সংগঠনে যোগদানের পর অন্য ছাত্রসহ প্রশিক্ষণ ও তালিম নেওয়ার জন্য হুজি নেতা মুফতি ইজহারের চট্টগ্রামের লালখান মাদরাসায় যান ও তালিম গ্রহণ করেন। তালিম শেষে সেখানে তিনি বোমা তৈরি, আত্মরক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। মুফতি হান্নান সংগঠনের অপারেশনাল কার্যক্রমের জন্য সাহসী জিহাদি বিশ্বস্ত কয়েকজন লোক সংগ্রহ করার জন্য মাওলানা আমিরুল ইসলামকে দায়িত্ব দিলে তিনি আজিজুল হককে নির্বাচন করেন। আমিরুল ইসলাম তাকে একটি চিঠি লিখে দিলে সেটা নিয়ে গোপালগঞ্জ বিসিক এলাকায় সোনার বাংলা সাবান ও মোমবাতি তৈরির কারখানায় যান।

মুফতি হান্নানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে মাওলানা আমিরুল ইসলামের দেওয়া চিঠিটি দেন তিনি। মুফতি হান্নান তাকে সংগঠনের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে বুঝিয়ে দেন ও আজিজুল হকের নাম পরিবর্তন করে ছদ্মনাম ‘শাহনেওয়াজ’ দেন।

সিসিটিসি প্রধান আরও বলেন, আজিজুল হক নতুন নাম শাহনেওয়াজ পরিচয়ে প্রায় ১৫ দিন মোমবাতি প্যাকিংয়ের কাজ করেন। বিশ্বস্ততা অর্জন করলে কারখানার পেছনে একটি কক্ষে গোপন বৈঠকে উপস্থিত থাকার অনুমতি পান। কারখানায় মোমবাতি ও সাবান তৈরির আড়ালে বোমা তৈরির কাজ চলতো। বোমা তৈরির কাজে আজিজুল হকসহ মো. ইউসুফ ওরফে মোসহাব, মেহেদী হাসান ওরফে আব্দুল ওয়াদুদ, ওয়াসিম আক্তার ওরফে তারেক হোসেন, মো. মহিবুল ওরফে মফিজুর রহমান, শেখ মো. এনামুল হক, আনিসুল ইসলাম ওরফে আনিসসহ আরও অনেকেই জড়িত ছিলেন।

আজিজুল হক দীর্ঘ ২১ বছর ছদ্মবেশে নানা পেশার আড়ালে নিজেকে আত্মগোপন করেন। ২০০৭ সালে নিজের পরিচয় গোপন করে বিয়ে করেন তিনি। কয়েকবার দেশ ত্যাগের পরিকল্পনাও করেছিলেন, কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ভিন্ন ভিন্ন নামে আত্মগোপনে ছিলেন। তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখতে টেইলারিং, মুদি দোকানি, বই বিক্রেতা, গাড়িচালক ও সবশেষ প্রিন্টিং ও স্ট্যাম্প প্যাড বানানোর কাজ করতেন।

ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি পালিয়ে ছিলেন দেশেই। তবুও তাকে গ্রেফতারে দীর্ঘ ২১ বছর কেন লাগলো? গোয়েন্দা ব্যর্থতা রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত কমিশনার আসাদুজ্জামান বলেন, আজিজুল হক ঘন ঘন জায়গা পরিবর্তন করতেন। ২১ বছর লাগলেও ব্যর্থতা নয় সফলতা এবং কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট সাকসেসফুল হয়েছে। এই সংগঠনের সব শীর্ষ জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলায় আরও চারজন- মো. ইউসুফ, মো. লোকমান, শেখ মো. এনামুল ও মো. মিজানুর রহমান পালিয়ে আছেন। তাদেরও আমরা গ্রেফতার করতে পারবো বলে আশা করছি।

দেশে থেকেও আজিজুল হক সংগঠনের কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। দেশের কোথাও নাশকতা কিংবা হামলার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না আজিজুল হকের? এমন প্রশ্নের উত্তরে সিটিটিসি প্রধান বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন কোনো তথ্য তার কাছ থেকে আমরা পাইনি।

ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেফতারে উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম) মো. মাহফুজুল ইসলামের নির্দেশনায়, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ইকোনমিক ক্রাইম অ্যান্ড হিউম্যান ট্রাফিকিং টিম) ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগ মো. তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে ও সহকারী পুলিশ কমিশনার (ইকোনমিক ক্রাইম অ্যান্ড হিউম্যান ট্রাফিকিং টিম) ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগ মুহাম্মদ রাইসুল ইসলামের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালিত হয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

Most Popular

Recent Comments