রাত সবেমাত্র নয়টা। হঠাৎ একটি ইঞ্জিন চালিত নৌকা গ্রামের পাশে গিয়ে থামে। গ্রামের একটি বাড়ি থেকে ‘খবরদার খবরদার’ বলে চিৎকার করেন কয়েক জন। মুহূর্তের মধ্যে সেখানে জড়ো হন অনেকে। তারা হাওরে থাকা নৌকার মাঝিকে উদ্দেশ্য করে ঘাটে ভিড়াতে বলেন। মাঝি জানান, তিনি যাত্রী নিয়ে ডাবর নামক স্থানে যাবেন। সেখানে গাড়ি অপেক্ষা করছে। ডাবর থেকে গাড়িযোগে যাত্রীরা সিলেটে যাবে। কিন্তু জড়ো হওয়া লোকজন তা বিশ^াস করতে রাজি না। তারা নিজ চোখে দেখে নিশ্চিত হতে চান। তাদের একজন চিৎকার করেই বলতে থাকেন ‘এটা ডাকাইতের নাও কি-না, চেক করতো অইবো। আমরার সন্দেহ অয়রো।’ নৌকায় যারা ছিলেন তাদের একজন এলাকায় বেশ পরিচিত। তিনি বের হয়ে চিৎকার করে নিজের পরিচয় দেন। নিজের মুখে লাইটের আলো ফেলে গ্রামবাসীকে দেখিয়ে তবেই রক্ষা পান। ওই নৌকার যাত্রী একটি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা রাজু আহমেদ জানান, গ্রামবাসী আমাদের নৌকাকে ডাকাতের নৌকা ভেবে আক্রমনাত্বক হয়ে উঠেছিলো। তাদের মধ্যে ডাকাত আতঙ্ক প্রবল। ঘটনাটি ঘটে গত বৃহস্পতিবার রাতে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের বীরগাঁও এলাকায়। বন্যা দূর্গত হাওর এলাকায় ডাকাত আতঙ্কে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে মানুষ। পুলিশের নির্দেশনায় গ্রামে গ্রামে যুবকদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে প্রতিরোধ টিম। পুলিশ বলছে এসব কারণে ডাকাতির ঘটনা ঘধটছে না।
‘ডাকাতি হচ্ছে। ডাকাতরা হামলা করেছে। ডাকাতদের সঙ্গে মারধর হচ্ছে।’ এরকম তথ্য বেশি প্রচার হচ্ছে ফেসবুকে। পুলিশ জানিয়েছে, বন্যা শুরুর পর এ পর্যন্ত ডাকাতির কোনো ঘটনা ঘটেনি। ছিঁচকে চুরির ঘটনা ঘটেছে। ডাকাতির বিষয়টি মূলত গুজব বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা। গত বৃহস্পতিবার রাতে সুনামগঞ্জের বাসিন্দা চিত্রশিল্পী খালেদ চৌধুরী তার ফেসবুকের টাইমলাইনে ডাকাতি সংক্রান্ত একটি পোস্ট দেন। তিনি লিখেনে ‘এই মুহূর্তে আমি ফোন করে জানতে পারলাম দিরাই’র বাউল শাহ আব্দুল করিমের গ্রাম ধলের চৌধুরী বাড়িতে ডাকাত দল লুটপাট মারপিট করছে। দ্রুত এলাকাবাসী ও পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। গ্রামবাসী প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছে।’ পরবর্তীতে তিনি জানান, ‘ শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ধল গ্রামবাসী সম্মিলিতভাবে ডাকাতদের তাড়া করে ভরাম হাওরে তাড়িয়ে দিয়েছে। চৌধুরী বাড়ির জয়নাল মিয়ার ঘরে ঢুকে ছিল। সাথে আরও তিনটি বাড়িতে সন্ধ্যায় আক্রমণ করেছিল। আলহামদুলিল্লাহ ধল গ্রামবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ডাকাতদের তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।’ তাড়ল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলী আহমদ বলেন, ‘ডাকাতির কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে ডাকাতরা হানা দিয়েছিলো। গ্রামবাসী প্রতিরোধ করেছে।’ তিনি জানান, বন্যা শুরুর পর ডাকাত আতঙ্ক বেড়েছে। মানুষ নির্ঘূম রাত কাটাচ্ছে। পাহারা দিচ্ছে। তবে কোথাও ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও তা থানা পুলিশ পর্যন্ত যাচ্ছে না। মামলা হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত বুধবারে ভরামের হাওরে বানাইত গ্রামে দিনের বেলাতে একটি ধানের নৌকায় লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে শুনেছি। কিন্তু এ নিয়ে কোনো মামলা হয়নি।’
হাওরে রাতে নৌকা দেখলেই আতঙ্কে চিৎকার করেন গ্রামবাসী। ১৯ জুন রাত ১২ দিকে সুনামগঞ্জ থেকে হঠাৎ ফোন সিলেটে অবস্থানরত এক আত্মীয়ের কাছে। বাসায় ডাকাতরা হামলা করেছে। এইটুকু বুঝতে পারেন। তারপরই সংযোগ বিচ্ছিন্ন। তখন মোবাইলফোনের নেটওয়ার্ক কাজ করছে না বন্যা দূর্গত ওই এলাকায়। সিলেটে অবস্থানরত ওই আত্মীয় জানান, সুনামগঞ্জে ময়নার পয়েন্টে তার ঘনিষ্ঠ জনের বাসায় ডাকাত আক্রমণ করেছে এটি জানার পর থানা পুলিশের নম্বরে জানাতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। নেটওয়ার্কে কাজ করছে না। সুনামগঞ্জের প্রায় কোনো ফোনেই সহজে কল যাচ্ছে না। বাধ্য হয়েই বিষয়টি ফেসবুকে শেয়ার করে সহযোগিতা চান। পরবর্তীতে জানা গেছে, একটি নৌকা হঠাৎ করেই রাতে ওই বাসার সামনে থামানোর চেষ্টা করে। লাইট দিয়ে বাসার ঢুকার রাস্তা দেখছিলো। সবাই চিৎকার করার পর নৌকাটি দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়। তাদের ধারণা এটি ডাকাতের নৌকা ছিল। সুনামগঞ্জ শহরে বিভিন্ন বাসায় ডাকাতি হয়েছে বলে গুজব ছড়ালেও প্রায় প্রতিটি ঘটনা অভিন্ন।
দিরাইয়ের ভাঙ্গাডহর, রাজনগর, তারাপাশা, হাতিয়া, জগদলসহ বিভিন্ন গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে মানুষ। গ্রামবাসী জানান, প্রতি রাতেই ডাকাত দলের একাধিক নৌকা আসে। পাহারা থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে তা মাইকে প্রচার করে গ্রামবাসীকে সচেতন করা হয়। মোবাইলফোনে সবাইকে জানানো হয়। যে কারণে ডাকাতির ঘটনা ঘটছে না বলে জাননা তারা। একই অবস্থা বন্যাকবলিত নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে হাওর এলাকার বাসিন্দারা। মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাশেদুল হাসান জানান, গ্রামবাসীদের মধ্যে ডাকাত আতঙ্ক বিরাহ করছে। পুলিশ পাঠিয়ে সত্যতা পাওয়া যায়নি। হাওরে রাতের বেলা মাছ ধরার ট্রলার দেখেও গ্রামবাসী চিৎকার চেঁচামেচি করে বলে জানান তিনি।
এসব বিষয়ে সুনামগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, বন্যায় মানুষ অভাবগ্রস্ত। ঘরবাড়িতে পানি। আসবাবপত্র প্রায় সবই অরক্ষিত। যে কারণে মানুষের মধ্যে একটা ভয় কাজ করে। রাতের বেলা নৌকা, অপরিচিত আলো দেখলেই তারা তারা ডাকাত আতঙ্কে চিৎকার করে। ত্রান নিয়ে যাওয়া নৌকা বা জেলেদের নৌকা দেখলেও তারা ডাকাত মনে করে। এই বন্যায় চুরি ছাড়া ডাকাতির কোনো ঘটনা সুনামগঞ্জ জেলায় ঘটেনি বলে জানান এসপি। তিনি বলেন, গ্রামে গ্রামে জনসাধারণকে নিয়ে প্রতিরোধ টিম গঠন করা হয়েছে। ডাকাত প্রতিরোধে পাহারা, পুলিশকে তথ্য দেয়া ও গণপিটুনি থেকে রক্ষা করার বিষয়ে তারা কাজ করছে। এই টিমের সফলতা আমরা পাচ্ছি।



